"আলফা"(২০১৯) নিয়ে আলাপঃ নাসির উদ্দীন ইউসুফের রেবেল উইদাউট আ কজ
আলফা সিনেমা সম্পর্কে নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “আধুনিক শহরে একজন মানুষ ক্ষয়িষ্ণু শিল্পমাধ্যম (বিলবোর্ড, ব্যানার আঁকার কাজ) নিয়ে কাজ করেন। যান্ত্রিক এ শহরে বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে তাঁর বেঁচে থাকার চিত্র দেখা যাবে এ ছবিতে”। এই যান্ত্রিক “বাস্তবতা” আর “অন্তর্দ্বন্দ্ব” পুরো সিনেমাতে দার্শনিক, না মূল গল্পের অংশ, রূপক নাকি সোজাসাপ্টা আলাপ, ব্যাক্তির যন্ত্রণা নাকি সমষ্টির পীড়ণ- এই রকম বেশ কয়েকটা বাইনারির ছড়ানো-ছিটানো চিত্রায়ন আপনার মনোযোগ-মনোবলের পরীক্ষা নিতে পারে । ফলে, বাস্তব ও পরাবাস্তবের মাঝামাঝি বিবাদমান ফরবিডেন লজিক এই সিনেমার লক্ষ্য/ চিত্রায়ন/ শেষ কথা- কিছু ক্ষেত্রে অদরকারী ও উচ্চাভিলাষী।
সিনেমায় প্লটের থেকে পয়েন্ট অফ ভিউ বেশি জোড়ালো ভাবে নির্দেশিত। আর্টিস্ট বলে পরিচিত একজন যুবক, যিনি একজন পেইন্টার, তার চিন্তা-ভাবনা, পারিপার্শিক, জগতের সাথে তার যোগাযোগ, চলমান সামাজিক/রাজনৈতিক/সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সাথে তার মিথস্ক্রিয়াই সিনেমার কাঠামো। তিনি থাকেন একা, স্ব-নির্ভর, জলাধারের উপর তার বাড়ি। বাবা-মার পরিচয় নেই। ছোটবেলায় পালক বাবা ও তার পেইন্টার হওয়ার পেছনের তার প্রভাব, দুটি প্রধান ধর্ম ছোটবেলায় তার উপর কিরূপ মিশ্র প্রভাব ফেলে এবং এর ফলাফল- এই হচ্ছে সিনেমার মূল আলাপ।
সিনেমার মূল চরিত্র দিয়ে নির্মাতা এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিটের ধারণা দেন যে কিনা
-হাতে একে আয় করে,
-আধুনিক ডিজিটাল পেইন্টিং এর কারণে আয় হারাতে থাকে,
-যার মালামাল বহন করে একটি প্রানী,
-একটি ঘরে একা থাকে,
-শহরে বেমানান কিন্ত বস্তিতে চলনসই,
-প্রায়ই ধ্যান করতে করতে নিজের ভেতর হারিয়ে যায়,
-বাশি বাজায়, মোতসার্টের বাজনা শুনে বিমোহিত হয়,
-যার চারিপাশ পশু-পাখি-প্রকৃতি দিয়ে আচ্ছন্ন থাকে।
এই সমস্ত উপকরণ একসাথে একটি প্যাকেজ হিসেবে বিবেচনা করলে কি দাঁড়ায়? একজন স্রোতের বিপরীতে চলা মানুষ, কন্সিউমারিজম কে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো, পুজিবাদ কে পাশ কাটানো একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি, একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক-আর্থিক-সাংস্কৃতিক ইউনিট। আলফা নামের অর্থ সরল অর্থ হচ্ছে কোনো দলে বা গোষ্ঠিতে ডমিনেন্ট/ কর্তৃত্বপূর্ণ/ প্রভাবশালী সদস্য। সিনেমা আসলে আলফা কে? আমরা কি কোনো আলফা কে দেখি? বরং চারপাশে বিটা চরিত্র দিয়ে ভরপুর(আলফার পরের সদস্য-অর্থাৎ অগুরুত্বপূর্ণ/প্রভাব কম এমন)। সিনেমার টাইটেলটি তাই স্বাভাবিক ভাবেই একটি অতিকায় আইরনি বা পরিহাস যার কেন্দ্রে আছে আর্টিস্ট বা শিল্পী! সিনেমাটি আলফা-দের নয়, বরং আলফা হতে কেমন লাগে, আলফা হওয়া যায় কিনা, আলফা হওয়া সম্ভভ কিনা সেটি নিয়েই এক্সপেরিমেন্ট করে। একেবারে শেষ দৃশ্যে যেখানে ফ্রেমে অর্ধেক আকাশ, অর্ধেক সাগর থাকে-সাদা কাফনে মোড়ানো দেহটি ভেসে যেতে থাকলে মনে হয় পুরো জগতটি একটি থিয়েটার অফ এবসার্ড- অর্থহীন, পরিণতিহীন কিংবা নিরর্থক, অকার্যকর এক মঞ্চ!
“হেকমত উল্লাহ মাঙ্গের পোলা
স্ক্রু ঢিলা, বুদ্ধি টাইট
লেফ রাইট লেফ রাইট”
হেকমত উল্লাহ হচ্ছে ডিস্টোপিয়ান, যান্ত্রিক, হাহাকার নগরীর কন্ডিশন্ড, মেনে নেয়া-মানিয়ে নেয়া, অসহায় মানুষের প্রতিনিধি। তার অক্ষম পুরুষত্ব, বাচ্চা জন্ম না দিতে পারা অক্ষমতা রাষ্ট্রের আইডলজিকাল এপারেটাস ও রিপ্রেসিভ এপারেটাসের বিকলাঙ্গ পরিণতি। যদিও খুব স্পষ্ট, বিস্তারিত কোনো ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট নেই তবে হেকমত উল্লাহ হচ্ছে আর্টিস্ট ক্যারেক্টারটির ফয়েল। ফয়েল কি? সাহিত্যে ফয়েল হচ্ছে এমন একজন চরিত্র যিনি আরেকটি চরিত্রের বিপরীত। অর্থাৎ আরেকটি চরিত্রের পজিটিভিটি, অপটিমিজম প্রকাশের জন্য নির্মাতা একটি নেগেটিভ, পেসিমিস্ট চরিত্র তৈরি করেন। ফয়েলের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো চরিত্রের দিকে বিশেষ নজর আকর্ষণ করা, পার্থক্য করা, তুলনা করা। যেমন ধরেন, জে.কে রাউলিং এর হ্যারি পটারে হোগওয়ার্টসে হ্যারির ফয়েল কে? এক কথায় উত্তর ম্যালফয় বা স্বয়ং ভল্ডেমর্ট। জেমসের ফয়েল লুসিয়াস। যাই হোক, হেকমত উল্লাহ যেমন অক্ষম, কন্ডিশন্ড, ডিজিটাল, নেশা দ্রব্য বিক্রেতা, ইভিল তেমনি আর্টিস্ট হচ্ছে সক্ষম( বাচ্চাটা তারই থাকে), রেবেল, ছবি একে উপার্জনকারী, গুড। এই বাইনারি চরিত্র চিত্রায়ন বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। স্ক্রু ঢিলা, বুদ্ধি টাইট
লেফ রাইট লেফ রাইট”
আলফা সিনেমার সবচেয়ে ইন্ট্রিগিং, সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর সিকোয়েন্স হচ্ছে সাদা ক্যানভাসে আর্টিস্টের মর্মভেদী বিলাপ। যেহেতু আর্টিস্ট এর কারবার সব রং দিয়েই, তার হাসি-খুশি-শোক-আহাজারিও রং দিয়ে। গার্মেন্টসে আগুন লাগার খবর তার অস্থির মন কে একেবারে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয়, একেবারে দিশেহারা আর্টিস্ট খুজতে থাকে এই বিষম যন্ত্রণা কে পরিবহন করার কোনো শৈল্পিক এক্সপ্রেশন। ফলে, রঙে রঙেই আর্তনাদ। যদিও জীবন কে চালিয়ে নেয়ার অমোঘ সত্য কে মেনে নিয়ে কিছুক্ষণ পড়েই সেই রং গা থেকে ধুয়ে ফেলা হয়।
ডেড বডি এই সিনেমার বেশ কয়েকটি সিম্বল হিসেবে ফাংশন করে। মৃত দেহটি দেখা মাত্রই আর্টিস্ট তার ছোট বেলায় তার পালক পিতার কারফিউতে মৃত্যু (যেটির ব্যাকগ্রাউন্ড খুবই অস্পষ্ট ভাবে দেখানো হয়েছে) ও তার অকালে ভেসে যাওয়ার চিত্র মনে করে। লোকাল একটি ইভেন্ট বৃহত্তর অর্থে ইউনিভার্সাল কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে কি? এছাড়াও মন্দ ভাগ্য, অতীত ও অনর্থক জীবন কেও এটি নির্দেশ করে। মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি, আর্টিস্ট যত গুলো সংকটে পড়ে, সমস্ত সংকটের চূড়ান্ত রূপ ও পরিণতির বোবা সিম্বল হচ্ছে এটি। এই সময় আর্টিস্টকে কিছুটা স্কিতজোফ্রেনিক মনে হয়- থানা থেকে পুলিশ এসে ডেড বডি প্রথমে খুঁজে পায় না-তবে পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়ার কারণে ও ডেড বডির পকেট থেকে নাম ঠিকানা উদ্ধারের ঘটনায় স্কিতজোফ্রেনিয়ার চাহিদা ও সরবরাহ বেশিক্ষণ থাকেনা- ফলে আর্টিস্টের ডেড বডির প্রতি আচরণ খুবই বিক্ষিপ্ত। লাশঘরের “ডোমদের” রিপ্রেজেন্টেশন ব্যক্তিগত ভাবে আমার কাছে একপেশে, স্টেরেওটিপিকাল লেগেছে। এই বিষয়ে লেখাপড়া না থাকায় আলাপ করা গেলো না। ধর্ম ও লিঙ্গ - এই দুটি বিষয়ের বাড়াবাড়ি ও কমাকমি আর্টিস্ট কে খুব যন্ত্রণা দেয়। সিনেমাতে তার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী একজন হার্মাফ্রোডাইট বা প্রচলিত ভাষায় “হিজরা”। আর্টিস্টের আঁকা একটি ছবি দেখে পুলিশ অফিসার ভয় পেয়ে চলে যান-ছবিটি হচ্ছে একটি দেহে নারী-পুরুষের সহাবস্থান। মহররম-পূজার দ্রশ্য, ইসলাম-হিন্দু, নারী-পুরুষঃ সবকিছুর মাঝামাঝি একটি ভীষণ দরকারী সহাবস্থানে আমাদের আর্টিস্ট থাকতে চান। এই in-betweenness, transcience ভ্যিজুয়ালি দেখানো হয়েছে আর্টিস্টের থাকার জায়গাটির মধ্য দিয়ে- জায়গাটি বস্তিতেও নয়, শহরেও নয়-মাঝামাঝি কোনো জায়গায়। ফলে, লোকেশন এখানে প্রায় চরিত্রের মতো আচরণ করে। পুলিশ অফিসারের ভয় পাওয়া প্রমাণ করে, আমরা আমাদের প্রোগ্রামড ফাংশনের ভাইরে “ফরেন” কোনোকিছু কে প্রচন্ড ভয় করি আর এই ভয় কে চাপা দিতেই একে অস্বাভাবিক, বেধর্মী তকমা জুড়ে নিজেদের বাচিয়ে চলি।
সিনেমার সব থেকে প্রশংসনীয় ব্যপার হচ্ছে এর শব্দ পরিকল্পনা। এক্কেবারে স্টেট অব দ্য আর্ট না হলেও নিপাট ও মনোরম। বাংলাদেশী ল্যান্ডস্কেপ ও রিভার স্কেপের কিছু ফ্রেম মাঝে মাঝে উঁকি মারলেও ফোকাসড কোনো ইস্যু না থাকায় বিষয়টা জমতে পারেনি। সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দর্শনীয় কিছু বি-রোল দেখা যায় মুসলমানদের মহররমের মিছিলের। দুর্দান্ত শব্দ পরিকল্পনা, যথাযথ সময়ে দৃশ্যের সরবরাহ- পুরো আয়োজনটাই এক্কেবারে নড়ে-চড়ে বসতে ইঙ্গিত দেয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বিশেষ দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানে সিনেমার প্রটাগনিস্ট হারিয়ে গেছেন- দিগভ্রান্ত ও দুঃখী। এহেন ফোরশ্যাডোয়িং দেখে আমি অত্যান্ত আগ্রহ সহকারে দেখতে বসে গেলেও- বাকি সিনেমায় দেখেছি শুধু প্রথম জৌলুশের ক্রমাগত ক্ষয়। সিনেমার প্রথম দৃশ্যে যেমন শত শত মানুষের মুখ, শেষ দৃশ্যে একজন মানুষ- মৃত, লিঙ্গ বিহীন, অকুল সাগরে ভাসমান, শেষ যাত্রা। এই পুরো রূপকটি হজম করার জন্য দরকারী সিনেমাটিক চাপের অভাব বিপুল সম্ভাবনাময় এই প্রথম ও শেষ দৃশ্যের সিনথেসিস কে রীতিমত গলাটিপে হত্যা করে বলে আমার মনে হয়েছে। একের পর এক ভ্যিজুয়াল কিউ নির্মাতা দিয়েছেন ঠিকি কিন্ত কোনো সময় ঘটনা, কোনো সময় উপযুক্ত সংলাপ, কোনো সময় আবহ সঙ্গীতের অভাবে সেই কিউগুলো শতভাগ সফল হতে পারেনি। 1:17:57, 1:19:54 সময়ে তালা খোলার জন্য যে শিশুতোষ শব্দ-দৃশ্যের ভেলকি দেখানো হয়েছে, মাঝে একই ফ্রেম থেকে জোড়া দেয়ার যে টেকনিক- ভালো লাগেনি। তবে ভালো লেগেছে 33 মিনিটের সময় আর্টিস্ট আঁকতে আঁকতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাধাপ্রাপ্ত হলে আবহ সঙ্গীত বন্ধ হয়ে যায়, মোম জ্বেলে আবার আকতে বসলে ফিরে আসে আবহ সঙ্গীত। ব্যাপারটা চমৎকার ভ্যিজুয়াল স্টোরি টেলিং, উইথাউট টেলিং এনিথিং লিটারেলি। নিউমার্কেটের গেট কে পিছনে রেখে এরপর অন্য লোকেশনে সিডির দোকানে আর্টিস্ট কর্তৃক মোতসার্ট শ্রবণ খুবই আলসেমি সিনেমাটিক ভেঞ্চার।
শেষের কথা, বাংলাদেশ থেকে অস্কারে সেরা বিদেশী চলচ্চিত্রের ক্যাটাগোরিতে শর্টলিস্টেড হওয়ার লড়াইর জন্য সম্প্রতি আলফা কে মনোনিত করেছেন বাংলাদেশের অস্কার প্রিভিউ কমিটি। বিক্ষিপ্ত কিন্ত শৈল্পিক এক সিনেমা হিসেবেই আলফা মনে থাকবে। এই নির্মাতার আগের একাত্তরের যিশু(১৯৯৩), গেরিলার(২০১১) সাথে কোনো মিল নেই এই সিনেমার। নতুন পথে হাটার এই সৎসাহস সবার হয় না। ব্যক্তিগতভাবে, আমার কাছে আলফা একটি অসম্পূর্ণ কিন্ত দারুণ আশাবাদী এক সিনেমা। কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া “লাইভ ফ্রম ঢাকা” আর আজকের এই “আলফা”- বাংলাদেশের সিনেমায় উঠে আসছে গ্রেট আনসার্টেইন্টি, গ্রেট ডিপ্রেশন আর আটকে পড়া মানুষের ফিসফিস। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের “সাজ্জাদ” আর নাসির উদ্দীন ইউসুফের “আর্টিস্ট” - দুই অতৃপ্ত আত্মা, রেবেল উইথআউট আ কজ এবং দুইজনই ঢাকার এবসার্ড হিরো।
আলফার জন্য শুভকামনা, মতামত জানাতে ভুলবেন না। আলফা পারবে একাডেমি পুরষ্কার মঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে?
একনজরে আলফা
কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনাঃ নাসির উদ্দীন ইউসুফ
প্রযোজকঃ ফরিদুর রেজা সাগর ও এশা ইউসুফ
দৈর্ঘ্যঃ ১ঘন্টা ৩০মিনিট ২৮ সেকেন্ড
ধরনঃ ড্রামা, ট্রাজেডি?





Comments
Post a Comment