Happy As Lazzaro(2018) Bangla Review


যুদ্ধ কিংবা শান্তি ,সঙ্কট বা সমৃদ্ধি - সব যুগে সব কালে মানুষের ভেতরকার পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা অভিন্ন রূপে বিরাজ করে । ইতালির ঠাস বুননের এক প্রত্যন্ত গ্রাম ও পুঁজিবাদী শহরের প্রেক্ষাপটে স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে মানুষের ভেতরকার সেই শাশ্বত উদারতার গল্প এলিস (এলিচে) রোরবাকাহার(রোরবাখার) হাজির করেছেন “লাজ্জারো ফেলিচে” /Happy As Lazzaro (2018)  সিনেমায় । অতীত ও বর্তমানের কঠোর যাঁতিকলে ফেলে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন এই সাধুতার উপযোগিতা ,সমসাময়িকতা ও যৌক্তিকতা ।ইতালির পল্লী এলাকার নজরকাড়া দৃশ্যায়ন,স্থানীয় সংকৃতির সরল উপস্থাপনার সাথে শহর এলাকার স্বাভাবিক কৃত্রিমতা আর টানাপোড়েনের পাশাপাশি তুলনায় জমে উঠে সিনেমার গল্প।


ইতালির পল্লী এলাকার তামাক চাষ নির্ভর গুটিকয়েক মানুষের বিড়ম্বিত ভাগ্য নিয়ে শুরু হয়েছে সিনেমার প্রথম অংশের গল্প। ইতালিয়ান তামাক শ্রমিকদের আটপৌরে চালচলনের ঘনিষ্ঠ চিত্র এই অংশে তুলে এনেছেন পরিচালক । প্রেম নিবেদনের ইটালিয়ান কায়দার দৃশ্যায়নের মাধ্যমে সিনেমা শুরু হয় । ভিন্ন এক সংস্কৃতির সাথে পরিচয়ের বদৌলতে পরিচালক দর্শকের মন ও মনোযোগ দুটোই কেড়ে নেন । একের পর এক দেখাতে থাকেন ইনভায়োলিতা নামক গ্রামের অধিবাসিদের নিত্যদিনকার জীবনের গাঢ়, অন্তরঙ্গ ও মনমোহন দৃশ্যাবলী। গ্রামীন শ্রমিকদের জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ সিনেমাটিক সরল অনুবাদে দর্শক যখন পুরোপুরি নিমজ্জিত, ঠিক তখন আমরা জানতে পারি এই সব সহজ মানুষদের কে ভীষন ভাবে ঠকাচ্ছেন তামাক ক্ষেতের মালিক মারকেসা আলফন্সিনা ডি লুনা।গ্রাম থেকে বের হওয়ার একমাত্র ব্রিজটি ভেঙে পড়ায় দৃশ্যত বাইরের জগৎ থেকে সম্পূৰ্ণ বিচ্ছিন্ন ইনভায়োলিতা। মালিক খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান এর বিনিময়ে উদয়-অস্ত খাটিয়ে নেয়, শ্রমিকেরা জানতেও পারে না এরূপ ব্যবস্থা অনেক আগেই ইতালির সরকার নিষিদ্ধ করে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজের নীতি চালু করেছে। সিনেমার শুরু থেকেই খুব দ্রুত আমরা মূল চরিত্র লাজ্জারোর সাথে পরিচিত হই।একদল বঞ্চিত মানুষের মাঝে ততধিক বঞ্চিত লাজ্জারোর সাথে দর্শকের মানসিক সংযোগ সিনেমার শুরু থেকেই ধীরে ধীরে গাঁঢ় হতে থাকে। এখানকার শ্রমিকদের কে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেয়ার বদলে বর্গাচাষী বানিয়ে ঠকানোর এই কায়দায় আনফন্সিনার সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে তার ছেলে তানক্রেদি, অন্যায় তামাক ব্যবসার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তানক্রেদি চরিত্রটি এমন ভাবে করা যেন প্রথম দেখাতেই তার প্রতি এক ধরনের বিরাগ ও বিতৃষ্ণা তৈরি হয়,ঠিক যেমন লাজ্জারোর সাথে পরিচিত হওয়া মাত্রই দর্শক আপন ও সমবেদনা বোধ করে। তবে ঘটনাচক্রে এই বৈপরীত্যের সম্মিলন ঘটিয়ে দেন পরিচালক, লাজ্জারো ও তানক্রেদি ঘোরতর বন্ধু বনে যায়। তানক্রেদি রুখে দাঁড়াতে চায় তার মায়ের শোষণের বিরুদ্ধে। লাজ্জারোর সাথে বিচিত্র এক বন্ধুত্বের মাধ্যমে ইনভায়োলিতা গ্রামে এগিয়ে যায় সিনেমার কাহিনি।




সদয় চরিত্রের যুবক লাজ্জারোর সহজাত সরলতা কে দুর্বলতা ভেবে সবাই যে যার মতো তাকে ব্যবহার করে নেয়। লাজ্জারো তার কর্মক্ষেত্রের সবার সব কাজ বিনা বাক্যব্যায়ে করে দেয়। মালিক শ্রমিক কে শোষণ করবে, শ্রমিকেরা শোষণ করবে নিজেদের ভেতর - নিজের ছেলেকে বলা ক্ষেতের মালিকের এই স্বীকারোক্তি আমাদের কে সবল- দুর্বলের অমোঘ নীতি সম্পর্কে সজাগ । সিনেমার প্রথম অংকে ভালো ও মন্দের এই যুগপৎ অনিবার্যতায় লাজ্জারো থাকে অবিচল ও আশ্চর্য রকম স্থির- যেন সয়ে যাওয়াই তার ধর্ম, ভালোর অনুসন্ধান ও অপেক্ষাই জীবন। প্রথম অংকের মতো দ্বিতীয় অংকেও লাজ্জারোকে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার কোনো বাহ্যিক বা জোরপূর্বক চেষ্টা করতে আমরা তাকে দেখি না। বরং আশা ও সততার অবতার হয়ে লাজ্জারো একের পর এক মানুষ কে নাড়া দিয়ে যেতে থাকে। যারা জীবনের কঠোর বাস্তবতায় ক্রমেই নিজেদের ক্রমাগত কলুষিত করে যাচ্ছে, তাদের সামনে লাজ্জারোর উপস্থিতি যেন তাদের ঘুমন্ত বিবেক কে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলে। দ্বিতীয় অংকে লাজ্জারো খুঁজে ফিরতে থাকে ইনভায়োলিতার তার পরিচিত মানুষদের, যারা গ্রাম ছেড়ে এখন শহরে। শহরে অপরাধ, শঠতা আর মন্দের আহ্বান আরো বেশি আরো ব্যাপক ।এভাবে সিনেমার ঘটনা এগুলে আমরা বুঝতে পারি, লাজ্জারও প্রকৃত পক্ষে কোনো চরিত্র নয় বরং সততা, আশা ও আশাবাদের এক দুর্দান্ত রূপক। এর সংরক্ষণের ভেতরেই যে আমাদের টেকসই সুখ নির্ভর করে। লাজ্জারোর চারপাশের সবকিছু বদলে গেলেও সে অপরিবর্তিত থেকে আমাদের শেখাতে চায়, পরিবর্তিত পরিবেশে হয়তো জীবনধারণের উপকরণ ও আয়োজন বদলায় কিন্ত সুখ ও শান্তির মৌলিক রহস্য সেই আদি ও অকৃত্রিম মানবধর্মের ভেতরেও নিহিত: ধৈর্য্য, নির্বিরকার অপেক্ষা আর জিইয়ে রাখা আশাবাদ সব যুগে,সব ধর্মে ও সব জাতিতেই নিয়ে এসেছে অতি আকাঙ্খিত সমৃদ্ধি। 

সিনেমার এক পর্যায়ে চার্চে গান শুনতে যাওয়া লাজ্জারোকে তার ইনভায়োলিতার দল সহ বের করে দেয়ার পর সাথে সাথে চার্চের সঙ্গীতও বিদায় নেয়,ভেতরের সিস্টাররা দিশেহারা হয়ে খুজতে থাকে কোথায় গেল গান ,বাদক অবাক হয়ে খুজতে থাকে কোথায় গেলো সুর? এদিকে লাজ্জারোর সাথে থাকা দল চার্চ থেকে বিতাড়িত হবার পর আবিষ্কার করে, লাজ্জারো সাথে করে সেই গান নিয়ে এসেছে,তার আসে পাশে থাকলেই সেই গান শোনা যাচ্ছে। পরিষ্কার রুপক দৃশ্যের অবতারণা করে পরিচালক হয়তো বুঝতে ও বুঝাতে চেয়েছেন হ্যাপি এজ লাজ্জারো সময় পরিভ্রমণের গল্প- অনিবার্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জাঁতাকলে পড়ে ব্যক্তির আত্মার সঙ্কট ও উত্তরণ। ফিল্মটি অর্থনীতি, ধর্মীয় ও আইন ব্যবস্থার প্রতি এক সূক্ষ্ম সমালোচনার ভাব শুরু থেকেই ধরে রেখেছিলো।


লাজ্জারো শব্দটি ইতালিয়ান যার অর্থ ঈশ্বরের সাহায্য।সন্ত ল্যাজারাসের পুনরুত্থানের গল্পটি আমরা সবাই জানি যে যিশু খ্রিষ্ট তাকে মৃত্যুর পরে আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন পৃথিবিতে। শব্দগত ও অর্থগত জায়গাতে মিলের সাথে সাথে ল্যাজারাসের পুনরুত্থানের মতো লাজ্জারোর এক ধরনের পুনর্জন্ম হয় ইতালির গ্রাম থেকে শহরে যাত্রার সময়। যেন পরিচালক বলতে চান লাজ্জারোদের বসবাস সময়হীন এক জগতে যারা প্রত্যকে জায়গাতেই কিছু সময় অবস্থান করে মানুষকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে যায় একই কাজে অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোন জগতে।


কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পাওয়া এই সিনেমায় লাজ্জারো সিনেমা ও সিনেমার বাইরে সুখী জীবনের গোপন ফর্মুলা বাতলিয়ে দেয়। প্রচন্ড রকম ব্যস্ত,আত্মকেন্দ্রিক ও মুনাফালোভী এই দুনিয়ায় লাজ্জারোর আশাবাদের কি কোন মূল্য আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোজা প্রতিটি মানুষের জন্যেই এই সিনেমা।বাস্তব ও পরাবাস্তবের মিশেলে এই সিনেমা বলতে চায় যুগে যুগে মানুষে জীবন পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলেও বদলায়নি সুখ ও দুঃখের অনুস্নধান,কারন ও সমাধান।
 
 


Comments

Popular posts from this blog

"দেবী" (২০১৮) : জয়া প্রযোজক প্রথমবার নিয়ে কিছু আলাপ,ফিরে দেখা,চেক ব্যাক

ক্যাসিনো নিয়ে আলোচিত ১০ সিনেমাঃ দেখেছেন না দেখবেন?

"আলফা"(২০১৯) নিয়ে আলাপঃ নাসির উদ্দীন ইউসুফের রেবেল উইদাউট আ কজ