Kathbirali/ কাঠবিড়ালী (২০২০) Review


কাঠবিড়ালীঃ নিয়ামুল মুক্তার সিনেমায় হাতমকশ

এই সিনেমার অন্যতম প্রশংসার যে জায়গা আমার কাছে, সেইটা হচ্ছে সিনেমার প্রায় শেষের একটি শট- যখন হাসু ইটভাটা থেকে গ্রামে প্রবেশ করে তখন ডাচ এঙ্গেলে ধরা লং শট- ডাচ এঙ্গেল ক্যামেরা বাকা করে শট নিলেই হয়ে যায় না, কখন ও কেন এইটাও জানতে হয়, ফর্মের সাথে কন্টেন্টের যোগাযোগ করিয়ে দেয়া লাগে। কাঠবিড়ালীর প্রায় শেষের দিকে হাসুর গ্রামে এন্ট্রি নেয়ার দৃশ্যটি যথাযথ। ডাচ এঙ্গেল বা ডাচ টিল্ট বা ক্যামেরা হরাইজন্টাল/ভার্টিকালি বাকিয়ে শট নেয়ার সম্পর্কে দুইএক্টা কথা বলি। ডাচ এংগেলের জন্ম ডাচে না, জর্মন দেশে। জার্মান এক্সপ্রেশনিজম মুভমেন্ট থেকে ডাচ কাট, সেইটা নোস্ফেরাতু, ডক্টর ক্যালিগরি,মেট্রোপলিস হয়ে, হিচককের হাত ধরে ইংলিশ সিনেমায় আমদানী, দ্য থার্ডম্যান থেইকা নোয়া(র) সিনেমায় এর ব্যাপক ব্যবহার সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল, তারা বেশ চমৎকৃত হবেন। নাতসি পার্টির যন্ত্রনায় জর্মন নির্মাতারা দলে দলে এদিক সেদিক চইল্যা গেলে তার আচ হলিউডেও লাগে। পরাগরেণুর মতো এক্সপ্রেশনিজম জর্মন থেইকা চইল্যা আসে হলিউডে। এর প্রমাণ পাইবেন ১৯৪০ বা ১৯৫০ এর দশকে নোয়া ঘরানার সিনেমায়। যেমনঃ দ্য থার্ড ম্যান(১৯৪৯)/ ক্যারোল রিড। আলো-ছায়ার খেলা, ডাচ এংগেল বা টিল্টেড ক্যামেরা এঙ্গেল হইলো গিয়া দর্শক কে স্বাভাবিকতার আবহ থেকে ডিসঅরিয়েন্ট করে চরিত্র কি ভাবছে-করছে, তার মনোজগতের ভেতর প্রবেশ করানোর জন্য এক নিঞ্জা টেকনিক। সোজা কথা, সিনেমা হলের বা সিনেমার দেখার আরামের পরিবেশ থেকে পর্দার চরিত্রের ভেতরকার অস্থিরতা ও ডিসব্যালেন্স বোঝাতে দর্শক কে ডিসওরিয়েন্ট করার এই পদ্ধতি সহ আরো নানান কিছু জর্মন ফিল্মমেকাররা উদ্ভাবন করসিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে সময়ে। সিনেমায় সাবজেক্টিভিটি বা ব্যাক্তির পয়েন্ট অফ ভিউ কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এইসব সিনেমায়। সিনেমার ভেতর চরিত্র যেভাবে পৃথিবী কে দেখে, আমরাও অর্থাৎ দর্শক-কে সেভাবে দেখানোর প্রয়াস বোঝা ও প্রয়োগ করা যেন তেন কথা না। দর্শক কে ডিসব্যালান্স করার এই তরীকা যে নির্মাতা বুঝে প্রয়োগ করে, তাকে সেলাম। তবে, হাসু চরিত্রটির ক্লোজাপে ডাচ এঙ্গেল দেখতে বুকটা খা খা করছিলো বা রঙের কোনো ক্যারিশমাটিক আয়োজন- কিন্ত সেইসব না দেখে শুরুর দিকে দেখেছি খাপছাড়া, কন্টেন্টের সাথে সম্পর্কহীন, একেরপর শুধুমাত্র শ্রী-বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নেয়া ওয়াইড শট, এরিয়াল শটের ছড়াছড়ি- সাথে বিরক্তকর অযথা এডাল্ট দৃশ্য-সিনেমার প্লট ডেভেলপমেন্টে যার ভূমিকা সামান্যই- দারুণ কিছু আয়োজন কে ক্রমাগত ম্লান করেছে। তাই বলে কাঠবিড়ালী আদ্যপান্ত এরকম নয়- দোষে গুণে শেষ মেষ এটি আমার কাছে একজন উঠতি নির্মাতার উজ্জ্বল হয়ে উঠার এক সংকেত। এই হিসাবে, সহবাসের আগে ড্রাম রোল কি নির্দেশ করে, এটা অস্পষ্ট ডেসপাইট, বারে বারে এটি হাসুর অপ্রকৃতস্থতার বা ইভিল কোনো কিছুর ইশারা দিলেও, শেষমেষ দেখা যায় সে একজন হাবলা প্রেমিক।

লং শট/ ওয়াইড শট/ ফুল শট এবং কিছু ভেরি ওয়াইড শটের ছড়াছড়ি কিছুক্ষেত্রে চোখের আরাম হলেও, মাঝে মাঝে অযথা এক্সপ্লিসিট এডাল্ট সিন একেবারে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে যেমন বলা যায়, পাটক্ষেতের মধ্যে পরিষ্কার করে রাখা চতুর্ভুজ ফ্রেমের এরিয়াল শটের যেই এস্থেটিক সেটি এই শটের আগে বেহুদা এডাল্ট সিনে এর জৌলুশ হারায় অনেকখানি।একটি ওয়াইড শট বা লং শট দর্শককে বলে দেয় কোথায় দৃশ্যটি ধারণ করা, কে কে আছেন সেই দৃশ্যে এবং কখন সেই দৃশ্যটি নেয়া। বিশাল ক্যানভাসে এই শটে অভিনয় শিল্পীরা যেমন তাদের অভিনয়শৈলি প্রদর্শন করতে পারেন নেচে-গেয়ে-দৌড়ে, তেমনি একজন নির্মাতাও একটি বড়সর আবহে কাজ করার ও দেখানোর সুযোগ পান। এই দুইয়ের মিলনে আমরা পাই একটি জায়াগার সম্পূর্ণ চিত্র, সেখানে সিনেমার চরিত্রগুলোর কার্যকলাপের যাবতীয় বিবরণ। ফলে নির্মাতা দর্শককে যা জানাতে চান সেটির মূল প্রস্তাব পেশ করার সহজ হয়, মোটাদাগের ব্যাপারগুলো জানানো সম্ভপর হয়, চরিত্রগুলোর মধ্যকার পাওয়ার ডায়নামিক্স বোঝা শুরু হয়, সিনেমার আবহের মধ্যে খুব দ্রুত দর্শক কে নিমজ্জিত করা যায়। তবে এই ফর্মুলার অধিক প্রয়োগে, সিনেমার শুরুর দিকে বারবার মনে হচ্ছিলো, ব্যাপারটি শুধুমাত্র যেন এস্থেটিক-সিনেমার সাথে এর সম্পর্ক ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিলো একের পর পর কন্টেন্টের সাথে সম্পর্কহীন সিকোয়েন্স গুলোতে।

স্পর্শিয়া অভিনীত চরিত্র কাজলের অনুষঙ্গ এবং তার চরিত্রের যে পোর্টেয়ালঃ এই দুটইর মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে অনেক জায়গায় যেমন যার বাড়িতে চেয়ারম্যান কে বসতে দেয়ার মতো চেয়ার নেই তার চুল কখনোই স্ট্রেট/ শহুরে কাটের হ
ওয়াটা অসম্ভব না হলেও খুব বেমানান। ওতে চরিত্রের প্রতি যে দর্শকের যে ডিসবিলিফ সেটা সাসপেন্ড হয় না। সোজা বাংলায়, নট ক্রেডীবল, সারাক্ষনই মনে হতে থাকে সিনেমা দেখছি, দেয়ালটা ভাঙ্গা যায় না, মনে হয় না সিনেমার ভেতরে বাস্তবের প্রস্তাবনা দেখছি যেটা, এই গ্রামীন সেটাপে করা চলচ্চিত্রের জন্য দারুণ গুরুত্বপূর্ন।

সিনেমার টাইটেলের ব্যাপারে কিছু কথা বলি আসেন। জুমর্ফিজম বিষয়টা হচ্ছে, এনিম্যাল বা জন্তুর বৈশিষ্ট্য কে জন্ত নয় এমন কিছু যেমন মানুষের মধ্যে প্রবাহিত করা। যেমন ধরেন, স্পাইডারম্যান, ব্লাক প্যান্থার বা ব্যাটম্যান হচ্ছে জুমর্ফড সুপারহিরো। আবার ধরেন, দেবতাদের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি খেয়াল করা যায় যেমন গনেশ (হাতির আদল)। সাহিত্যে জুমর্ফিজমের সবচেয়ে কমন ব্যাপার হচ্ছে চরিত্রের সাথে সরাসরি কোনো প্রাণীর তুলনা, চরিত্রের বৈশিষ্টের সাথে প্রাণীর প্যারালাল। অর্থাৎ এনিম্যাল এট্রিবিউট বা বৈশিষ্ট্য আমি যখন নন-এনিম্যাল কোনো কিছুর ওপর প্রয়োগ করবো। মানুষের চরিত্র কে কাঠবিড়ালীর অস্থির চরিত্রের সাথে তুলনা করে সিনেমার টাইটেল? মন্দ নয়। একই সাথে আমরা রিলেট করতে পারি,সিনেমায় দেখানো একটি ল্যান্ডস্কেপের ক্রমাগত রূপ বদলঃ কখনো শুষ্ক, কখনো বা পানিতে টইটুম্বর। তবে, এই কাঠবিড়ালীত্ব আমদানী করতে গিয়ে নিয়ামুল মুক্তা অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েছেনঃ ঘটনাপ্রবাহের বিশ্বাসযোগ্যতা, অতি কল্পনাপ্রবণ ক্লাইমেক্স আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, অতি অতি উচ্চাভিলাষী ক্যারেকটার বিল্ডাপ। শুরুর দিকে কাজল-হাসুর মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম বিরাজ করলেও, কিভাবে সেটি ১৮০ ডিগ্রী ইউটার্ন নিয়ে বদলে যায় সেটির দিকে মনোযোগী হওয়ার বদলে দর্শক দেখেন বদলে যাওয়ার পরবর্তী ঘটনাক্রম, স্বপ্ন-ভঙ্গ, কাজলের কোপিং মেকানিজম এবং সবশেষে, এই পর্যন্ত টেনে আনা দর্শকের মনোযোগ নিয়ে খেলা। এই খেলা মুক্তা করেছেন প্রথমত হাসুকে গ্রামের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে, তারপর করেছেন চেয়ারম্যান পুত্র চরিত্রের মাধ্যমে। তবে, ময়নাতদন্তে কিভাবে হাসু পাড় পেয়ে গেলো সেটি এক বিরাট প্রশ্ন- ফ্যাক্ট আর ফিকশনের গলদ এখানেই। এই গলদ মুক্তা তার চিত্রনাট্যকারের ঘাড়ের ওপর ভর করে অতিক্রম করেছেন তার গল্প বলার ঢং এর মাধ্যমে। এই ব্যাপার থেকে যেটি ধরা যায়, স্টোরিটেলার হিসেবে তার পটেনশিয়াল থাকলেও, মনোযোগী দর্শক কাঠবেড়ালী দেখে তৃপ্ত হতে পারে না তবে, তার এইসব কারিশমা বলে দেয়, মুক্তার পরবর্তী সিনেমা নিশচই আরো পরিপক্ক, আরো নির্ভুল, ফ্যাক্ট আর ফিকশনের মধ্যে সিনেমার সেতুবন্ধন আরো জোরালো হয়েই হাজির হবে এই আশা করা যায়, করতে বাধ্য হয়।

সিনেমার একপর্যায়ে রাতের বেলায় গানের আসরের একটি দৃশ্য দেখা যায়। সেটি কি শুধুই একটি কালচারাল এলিমেন্ট হিসেবে সিনেমার মর্যাদা বৃদ্ধির উপকরণ নাকি সেটি সিনেমার প্লটেও কোনো কিছু কন্ট্রিবিউট করে- সেই ব্যাপারটি একদমই অস্পষ্ট যেহেতু সেটি দুটি তিনটি লাইন ও স্পর্শিয়ার দুর্বোধ্য হাসিতেই সীমাবদ্ধ।কিছু ব্যাপার রিসার্চের বিষয়বস্ত হইতে পারে। যেমনঃ চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান পুত্রের রিপ্রেজেন্টেশন, চেয়ারম্যান পুত্রের ক্যারেকটার কিভাবে দুষ্ট থেকে সাধুতে পরিণত হতে তার কস্টিউম তাকে সাহায্য করে, গ্রামের প্রেক্ষাপটে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণ ও পরিণতি, হাসুর সাইকোলজি, মেইল গেইজ বা পুরুষের দৃষ্টিতে সমগ্র ব্যাপারটির একচোখা দৃশ্যায়ন ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে অভিনয় নিয়ে বাংলা সিনেমার প্রতি যেসব অভিযোগ সচরাচর করা হয়ে থাকে,সেসব করার কোনো স্পেস রাখেননি- সবাই বেশ প্রানবন্ত ও সহজাত, কিছু ক্ষেত্রে দুর্দান্ত। গানগুলোও বেশ।"খেলতেই সুখ, বিয়েতে সুখ নাই"-সংলাপটির মাধ্যমে হাসুর বন্ধু চরিত্রে অভিনয় করা সৈয়দ জামান কে ফোরশ্যাডোয়িং করার ব্যাপারটি দারূন- একই সাথে মেলা থেকে কিনে আনা জোড় মূর্তিটি ভেঙে যাওয়াও নির্মাতার পক্ষ থেকে দর্শকের সাথে কমিউনিকেশনের দারূন দর্শন।

এরকম ভাবে, প্রথম সিনেমায় তুলনামূলক কম রিসোর্সে নির্মিত সিনেমা হিসেবে কাঠবিড়ালী কোনো “অতরের” জন্ম না দিলেও, একজন উদীয়মান নির্মাতার আশ্বাস দেয়। কাঠবিড়ালী কোনো গ্রেট সিনেমা না, একজন নির্মাতার প্রথম গ্রেট পদক্ষেপ। সেই পদক্ষেপটি বেশ ভালো। নিয়ামুল মুক্তার পরবর্তী সিনেমার অপেক্ষায়। সেইপর্যন্ত, সেলাম ও মারহাবা। পুরো সিনেমায় যে ব্যাপারটির জন্য নিয়ামুল মুক্তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা সেটি এবার বলিঃ যখন আপনি ইমোশনালি কোনো কিছুতে ইনভেস্টেড হবেন তখন আপনি সবচেয়ে কম ক্রিটিকাল, সবচেয়ে কম অবসার্ভেন্ট থাকবেন, অব্জেক্টিভ রিয়ালিটি বোঝা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। কাঠবেড়ালীর পরতে পরতে এই “ইনভেস্টমেন্ট” নিয়ে নিয়ামুল মুক্তা আর দর্শকের ইন্দুর-বিলাই খেলা চমকপ্রদ- যারা এই খেলায় বেশি খেলিত হয়েছেন, তাদের কাছে কাঠবেড়ালী সিনেমার অধিক, নিয়ামুল মুক্তা অতরের অতর কিছু কেননা তারা মগজের পরিবর্তে মন দিয়ে কথা বলেছেন আর এই কাজটি করেছেন মুক্তার গল্প বলার আর চিত্রনাট্যকারের লেখার ঢং। আর যারা ইমোশনাল ইনভেস্টের এই খেলায় ঢুকেও বের হয়ে নিয়ামুল মুক্তার আর চিত্রনাট্যকারের খেলা করার টেকনিক এঞ্জয় করেছেন, তারা বলেছেন, “হুম, বানাইতে থাকো”।
ফি-আমানিল্লাহ।

Comments

Popular posts from this blog

"দেবী" (২০১৮) : জয়া প্রযোজক প্রথমবার নিয়ে কিছু আলাপ,ফিরে দেখা,চেক ব্যাক

ক্যাসিনো নিয়ে আলোচিত ১০ সিনেমাঃ দেখেছেন না দেখবেন?

"আলফা"(২০১৯) নিয়ে আলাপঃ নাসির উদ্দীন ইউসুফের রেবেল উইদাউট আ কজ