"পাঠশালা" (২০১৮) - দিশি সিনেমার মুকুটে নতুন পালক


ট্রেইলার ব্রেকডাউন লিখে ফিল্মকাস্ট -এর কল্যানে শুক্রবার ১২.৪৫ এ পাঠশালার প্রিমিয়ার শো দেখে ভাবলাম, একই দিনের অন্য আরেকটি বাংলা সিনেমা মুক্তি পাওয়ায় চমৎকার এই সিনেমাটি কি পাত্তা পাবে ,আলোচনায় আসবে? পাঠশালা যারা বানিয়েছেন তারা আশা করছেন "শিশুরা" এই সিনেমা যেন দেখে( সিনেমার লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল শিশু কে নিয়ে দেখতে আসতে পারতাম কিনা)। ছোটদের জন্য সিনেমা বানানো সবচেয়ে কঠিনতম কাজ, কোমলমতিদের জন্য অনেক ভেবেচিন্তে তবে কোন কিছু স্ক্রিনে উঠাতে হয় বলে মনে করি। একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সাথে সিমপ্যাথাইজ করার জন্য পাঠশালার ঘটনা হয়তো অনেক সময় বাস্তব থেকেও একটু বেশি অলঙ্কারিত, তবে সেইটাও খুব সাবলীল ভাবে নিয়ে আসতে পেরেছেন আসিফ ইসলাম ও ফয়সাল রদ্দি । সবার শৈশব যে একই রকম রঙিন না,কারোটা সাদা কালো কিংবা ধূসর এবং কেউ কেউ যে রঙ ফিরিয়ে আনতে সামিল হয়,দীর্ঘ এপিক জার্নিতে সেই বোধটাই বোধকরি পাঠশালার অন্যতম লক্ষ্যনীয় দিক। এই লম্বা জার্নিটাই সিনেমার কঙ্কাল, এখন তাতে কিভাবে পাঠশালা টিম প্রাণ-ধর-পা দিয়েছেন তার বিচারক আমরা-আপনি-আমি। সেইটা নিয়ে অল্প স্বল্প আলাপ। একবার দেখে কোনো ভাবেই তো রিভিউ লেখা সম্ভব না। তবে অবশ্যই অবশ্যই এই শহরের হাজার হাজার মানিকের গ্রাম টু শহর মহাযাত্রার কাহিনী নিয়ে যে সিনেমা হয়েছে, তার জন্য দু-একটা কথা বলাই যায়। সাবধান হয়ে পড়ুন,হালকা স্পয়লার থাকতে পারে,পরে বলবেন না আমি স্পয়লারের এলার্ট দেই নাই।
মানিকের গ্রাম থেকে শহর যাত্রা একটি Odyssey-গ্রীকহিরোর মতো এপিক জার্নি না হলেও- তার উদ্দেশ্য আমাদের অতিচেনা ও বহুবার দেখা ঘটনা- ইস্কুল ছেড়ে কামে যোগ দেয়া। মাঝপথে মা অসুস্থ, তাকে চিকিৎসা করার বন্দোবস্তের সঙ্কট, টাকার সংস্থান।এরই মাঝে আবার মানিক চরিত্রটির ফয়েল(Foil) কালুর বাস্তববাদী প্রস্তাব, অসৎপথের হাতছানি। কালু বলে এই শহরে মানুষ চেনা দায়, "শর্টকার্ট" ছাড়া গতি নাই।এতো কিছুর মধ্যে মানিক কি পারবে তার ইস্কুলে পড়ার "লংকাট" স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে? মানিক কি পারবে তার মানিকত্ব বজায় রাখতে? এই সংকট ও তার থেকে উত্তরণ সিনেমার পর্দায় নিয়ে আসার জন্য পরিচালক(স) খুব চমৎকার ভাবে কিছু প্যারালাল স্টোরির ভিজুয়ালাইজেশন করেছেন।মানিকের রঙিন গ্রামের জীবন আর শহরের সাদাকালো পাথরের জীবনের মাঝে প্রায়ই যে দোদুল্যমান অবস্থা, তার ক্যামেরার ট্রান্সলেশন সবচাইতে চমৎকার বিষয় এই সিনেমার। এমনকি গ্রামের স্কুলে একটা কঠিন অংক সহজ ভাবে করার জন্য মাস্টারের পিঠে বাহবা দেয়ার হাত যখন পরিচালকের নিপুণ হাতে পড়ে ম্যাচ কাট হয়ে গ্যারেজের ওস্তাদের প্রশংসাসূচক পিঠের থাবড়া হয়ে যায় কারন মানিক অংকের মতোই গাড়ির ইঞ্জিনটাও ভালো বোঝে, তখন নড়ে চড়ে বসা লাগে। দেশি সিনেমা দেখছি তো?চোখ কচলাই।
একটি শিশুর গ্রাম থেকে শহরে চলে আসার পর আশা-নিরাশার দোলাচল সিনেমাটিক করে স্ক্রিনে দেখানোর সামর্থ্য এই সিনেমার অন্যতম চ্যালেঞ্জ এবং তাতে ৫০-৫০ সফল আসিফ-ফয়সাল প্রডাকশন "পাঠশালা"।
মানিকের কল্পনা ও বাস্তবে বার বার আগমন- প্রস্থানের যেই সব শট তিনি নিয়েছেন সেগুলো দেখে চোঁখের আরাম।সত্যি আরাম। এমনকি সিনেমার ইন্ট্রোর প্রথম কয়েক মিনিট দারুন রকম এপেলিং- সাথে সাথে সিনেমার প্লটের দ্রুত এক্সপোসিসন প্রশংসা না করে পারা যায় না।সোজা কথায়, এইখানে প্যাঁচঘোচা আর গোজামিল কম বা নাই তবে বাস্তবের অতিরিক্ত রকম ভদ্র ভার্সন রয়েছে, তবে সেইটাও এক্কেবারে ফেলে দেয়ার মতো না। এই রকম সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের দৈনিক রুটিন দেখে ভালোই লেগেছে(আসলে হলের বাচ্চারা দারুন উপভোগ করছিল) তবে একদম বাস্তব চিত্র আরো ভয়ংকর সেইটা আমরা সবাই কমবেশি জানি-দেখি-বুঝি-প্র্যাকটিস করি।যেহেতু এইটার অডিয়েন্স একটা সার্টেইন এরিয়ায়,হয়তো সেই জন্যেই এমন "রাস্তার" ছেলেদের এমন তুলনামূলক "ফিটফাট" রিপ্রেজেন্টেশন। অতি পজিটিভ দৃশ্যায়ন হয়তো কোমলমতিদের জন্য বলেই কিনা, সেন্সর্ড করা হয়েছে। তবে এই ভিন্ন ডাইমেনশনশনের শিশুদের জগৎ খুব সহজবোধ্য ডায়ালগ এবং উপযুক্ত হিউমার দিয়ে সুবিধা প্রাপ্ত শিশুদের প্রাথমিক ধারণা দেয়ার ক্ষেত্রে পরিচালক সফল,একদম সফল। একই কারনে একে নিও-রিয়ালিস্ট সিনেমা বলা যাবেনা, সর্বোচ্চ এই ঘরানার সিনেমা বানানোর একটা ছোটখাট প্রয়াস বলা যেতে পারে। যে বা যারা বলেছেন পাঠশালা এই ঘরানার, দুষ্টামি করে বলেছেন আমি নিশ্চিত। কারন সেই ঘরানার সিনেমার সুনির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা পাঠশালা দুই একটা ছুঁয়ে গেলেও কোনোটাই পূরণ করতে পারেনি।
অংক ভালো পারা মানিক শহরে কাজে যোগ দিয়ে তুখোড় মেকানিক বনে যাওয়া- এই যে মানিকের আগ্রহ ও সক্ষমতার যে ট্রান্সফর্মেশন ঘটছে, মানিক কি তার পথ বদলে গাড়ির মেকানিক হবে নাকি ইশকুলে পড়ুয়া বিজ্ঞানী হবে- টাইট হয়ে বসে থাকলাম সিনেমা হলে একেবারে শেষ পর্যন্ত। কোথাও মনে হয় নাই, সিনেমা অফ ট্র্যাকে চলে গেসে বা খাপছাড়া- একদম তরতর করে সিনেমার কাহিনী টানা চলে যায় শেষ পর্যন্ত। বেশ বেশ! আরেকটি দিক হচ্ছে এই সিনেমার বি-রোল ফুটেজ গুলো, খুব চমৎকার ভাবে চাইল্ড লেবারের কিছু ভিভিডি বি-রোল দেখে আমি মহা মহা খুশি।
তবে, কি ভালো লাগেনি এই সিনেমায়? ভালো লাগেনি ক্যারেক্টার ডেভেলপমেনটে হালকা তাড়াহুড়া, হঠাৎ হঠাৎ গানের আগমন(গানগুলো ভালো ছিল তবে কিছু ক্ষেত্রে আবহ টা পুরোপুরি তৈরির আগেই পরিচালক তার সেরা গানগুলো ছুঁড়ে দিয়েছেন বলে মনে হয়েছে।)
কি আশা করেছিলাম? মানিকের সংকট ও তার উত্তরণ আরেকটু জটিলতা,আরেকটু টেনশন। কেন যেন মনে হচ্চিল, মানিকের সংগ্রামটা ঠিকই আছে তবে বড় বেশি সহজ আর একটু বেশিই ফিল্মি তবে যেহেতু টার্গেটেড অডিয়েন্স হিসেবে বাচ্চাদের কথাই বলা হচ্ছে, সেই হিসাবে ইটস ওকে। গুড জব।
বাসায় ছোট কেউ থাকলে নিয়ে যান তাদের সিনেমায়, তারা বেশ উপভোগ করবে বলেই মনে হয়েছে- এমনকি একটা এনিম্যাটেড ইপিসোড ও আছে। আপনি কি আশা নিয়ে দেখবেন, কি পাবেন ,আমি কি আশা নিয়ে গিয়েছিলাম, কি পেয়েছি- এই সব প্রশ্নের থেকে বড় রিয়ালাইজেশন হচ্ছে:
"ছেড়ে দে শয়তান" থেকে " শিখনের ইচ্ছা থাকলে পুরা দুনিয়াডাই ইস্কুল" একধরনের সুখদায়ক টার্ন, আশাজাগানিয়া শপথ, পরিবর্তনের আভাস।এই বিষয় গুলা নিয়েই তো আমরা হা-হুতাশ করি বিদেশি সিনেমা দেখে দেশি সিনেমার তুলনায়। তবে ফল পাকতে দিতে হবে,সময় দিতে হবে এইধরনের প্রচেষ্টাকে তানাহলে ব্যাপারটা না বুঝেই "অদ্ভুত হিউম্যান ব্রেন" ব্যাপারটা "বোঝা" হয়ে গেছে বলে মনে করতে পারে।
ওভার অল ৬/১০। এই টিমের পরবর্তী সিনেমা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবো।
 


একনজরে পাঠশালা



ধরন           :শিশুতোষ, নিও-রিয়ালিস্ট(?), ড্রামা, সামাজিক
পরিচালক   :আসিফ ইসলাম ও ফয়সাল রদ্দি
লেখক        :ফয়সাল রদ্দি
অভিনয়ে    :নাজমুল হোসেন রাজু, ফারহানা মিঠু, রুমি হুদা, গাজী ফারুক, আমিরুল ইসলাম বাবু
স্থান/ভাষা   :বাংলাদেশ, বাংলাদেশী
মুক্তিকাল   :৩০শে নভেম্বর, ২০১৮

Comments

Popular posts from this blog

"দেবী" (২০১৮) : জয়া প্রযোজক প্রথমবার নিয়ে কিছু আলাপ,ফিরে দেখা,চেক ব্যাক

L F D: ঢাকার সিসিফাসের গল্প ( Live From Dhaka )

"আলফা"(২০১৯) নিয়ে আলাপঃ নাসির উদ্দীন ইউসুফের রেবেল উইদাউট আ কজ